পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুরে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবেশবান্ধব কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি, ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) উৎপাদন ও ব্যবহার এবং জৈব চাষাবাদে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মসূচিতে লোকসংগীত, জারিগান, কৃষিবিষয়ক পথনাটক ও মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে কৃষকদের পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার মহিপুর ইউনিয়নের ৪৫ নম্বর মনোহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কারিতাস বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চলের ধরিত্রী প্রকল্প এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। এতে আর্থিক সহযোগিতা করে ক্যাফোড (CAFOD—Catholic Agency for Overseas Development)।
‘বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তা তৈরি এবং বাজারজাতকরণ প্রকল্প (ধরিত্রী)’—এর আওতায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবেশবান্ধব কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমের প্রসার ঘটানো এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে সহায়তা করা।
কর্মসূচির শুরুতে সার্বজনীন প্রার্থনা করেন কাজল ঘরামী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ধরিত্রী ও এ্যাকরাব প্রকল্পের জুনিয়র কর্মসূচি কর্মকর্তা মি. জর্জ বৈরাগী।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলাপাড়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আশ্রাফ আলী হাওলাদার।
বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খান, কুয়াকাটা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মিজানুর রহমান রিপন ও গণমাধ্যমকর্মী মুন্সী ইউসুফ।
অনুষ্ঠানে ধরিত্রী প্রকল্পের মার্কেট প্রমোশন অফিসার মি. অসীম কুমার বিশ্বাস অংশগ্রহণকারীদের পরিচিতি পর্ব পরিচালনা করেন। পরে প্রকল্পের উদ্দেশ্য, কর্মসূচির লক্ষ্য ও পরিবেশবান্ধব কৃষির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে স্বাগত বক্তব্য দেওয়া হয়।
সচেতনতামূলক আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্থানীয় কৃষাণীদের অংশগ্রহণে লোকসংগীত, জারিগান ও কৃষি বিষয়ক পথনাটক। এসব পরিবেশনার মাধ্যমে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো, মাটির উর্বরতা রক্ষা, জৈব সার ব্যবহারের সুফল এবং ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন ও ব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় কৃষকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি ও কৃষিজীবী মানুষের জীবন-জীবিকায় নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি উৎপাদনকে প্রভাবিত করছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষিতে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির জৈব গুণাগুণ উন্নত করা সম্ভব। কৃষকেরা নিজেরাই তুলনামূলক কম খরচে কেঁচো সার উৎপাদন করতে পারেন। এতে একদিকে কৃষি উৎপাদনে জৈব উপাদানের ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট বাজারজাত করে কৃষকেরা অতিরিক্ত আয়ও করতে পারেন।
পরে অংশগ্রহণকারী কৃষক-কৃষাণীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে জিজ্ঞাসা ও মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় কৃষকেরা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের পদ্ধতি, ব্যবহার, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং জৈব চাষাবাদ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। সংশ্লিষ্টরা কৃষকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি গ্রহণে তাদের উৎসাহিত করেন।
বিশেষ অতিথিদ্বয় প্যানেল চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খান ও সাংবাদিক মো. মিজানুর রহমান রিপন স্থানীয় কৃষকদের পরিবেশবান্ধব কৃষির দিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কৃষির সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় কৃষকদের সম্পৃক্ত করে এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আশ্রাফ আলী হাং কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টেকসই কৃষি পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ধরিত্রী প্রকল্পের জুনিয়র কর্মসূচি কর্মকর্তা জর্জ বৈরাগী কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য অতিথি, কৃষক-কৃষাণী, সাংবাদিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ধন্যবাদ জানান। তিনি প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি এবং কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
Devoloped By WOOHOSTBD