মোঃ খাত্তাব হোসেন, বিএ অনার্স আরবি, কামিল হাদিস অধ্যয়নরত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়।
মানব ইতিহাসে যুগে যুগে অসংখ্য মহাপুরুষ এসেছেন। কেউ সমাজ সংস্কারক, কেউ রাষ্ট্রনায়ক, কেউ ধর্ম প্রচারক, আবার কেউ বিজ্ঞান বা দর্শনের মাধ্যমে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে ছিলেন সমাজ সংস্কারক, রাষ্ট্রনায়ক, সেনানায়ক, বিচারক, শিক্ষক, পথপ্রদর্শক ও সর্বোপরি মহান মানবদরদী—তিনি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
ষষ্ঠ শতকের আরব সমাজ ছিল ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত। মূর্তিপূজা, গোত্রীয় দাঙ্গা, নারী নির্যাতন, মদ্যপান, জুয়া, দাসপ্রথা এবং নৈতিক অবক্ষয়ে মানুষ দিকভ্রান্ত ছিল। নারী জন্মগ্রহণ করলেই তাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, দুর্বল জনগোষ্ঠীকে দাসে পরিণত করা হতো, শক্তিমানরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার চালাতো। ঠিক এই পরিস্থিতিতেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত পথপ্রদর্শক হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সা:)-কে প্রেরণ করেন।
৪০ বছর বয়সে নবুয়ত প্রাপ্তির পর তিনি ঘোষণা করেন—“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।” তিনি মানুষকে শেখালেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করার অধিকার নেই। তাওহীদের এই মহান বাণী শুধু আরব নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য ছিল মুক্তির দিশারী। তিনি বললেন, সব মানুষ এক, সবাই আল্লাহর বান্দা। এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই—কেউ সাদা বা কালো, ধনী বা গরিব, আরব বা অনারব বলে আলাদা নয়।
হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর চরিত্র ছিল পবিত্র ও অনন্য। নবুওয়ত লাভের আগেই তিনি “আল-আমিন” ও “আস-সাদিক” নামে পরিচিত হন, অর্থাৎ বিশ্বাসযোগ্য ও সত্যবাদী। ব্যবসায়িক জীবনে সততা, পারিবারিক জীবনে দায়িত্বশীলতা এবং সামাজিক জীবনে মানবপ্রেম তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।
মদিনায় হিজরত করার পর তিনি প্রথম যে কাজটি করেন তা হলো—মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে একত্র করে এক অনন্য সংবিধান প্রণয়ন করা, যা পরিচিত “মদিনা সনদ” নামে। এটি ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান, যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, সামাজিক সম্প্রীতি ও রাষ্ট্রীয় ঐক্যের মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনি শুধু ধর্মের বাণী প্রচার করেননি, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন, যুদ্ধ পরিচালনা এবং সমাজ গঠনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যুদ্ধে শত্রুর ওপর জয়লাভের পরও তিনি দয়া ও ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি তাঁর শত্রুদের বলেছিলেন—“আজ তোমাদের ওপর কোনো প্রতিশোধ নেই, তোমরা মুক্ত।” ইতিহাসে এমন দয়া ও মহত্ত্বের উদাহরণ বিরল।
হযরত মুহাম্মদ (সা:) নারীর সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন—“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রী ও পরিবারের সাথে উত্তম আচরণ করে।” তিনি শিশু, এতিম, দাস, প্রতিবেশী ও পশুপাখির প্রতিও সদয় আচরণ করতে শিখিয়েছেন।
চৌদ্দশত বছর আগে প্রেরিত এই মহানবীর শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। দুর্নীতি, সহিংসতা, বৈষম্য ও অবিচারে জর্জরিত এ পৃথিবী যদি সত্যিই শান্তি চায়, তবে হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
বিশ্বখ্যাত গবেষক ও দার্শনিকরাও তাঁকে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমেরিকান ইতিহাসবিদ মাইকেল এইচ হার্ট তাঁর বিখ্যাত বই “The 100”-এ সর্বকালের সেরা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের তালিকায় হযরত মুহাম্মদ (সা:)-কে প্রথম স্থানে রেখেছেন।
আজ আমাদের দায়িত্ব হলো মহানবী (সা:)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তা বাস্তবায়ন করা। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শই পারে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়নিষ্ঠ ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে।
নিশ্চয়ই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব—যাঁর আলোয় সমগ্র মানবজাতি চিরকাল পথ চলবে।
Devoloped By WOOHOSTBD