মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
নওগাঁর মান্দায় পৈত্রিক ও কবলা মূলে ভোগদখলীয় জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে রোপিত ধান গাছ মেরে ফেলার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। এতে ৩.৭০ একর জমির মধ্যে প্রায় ১ একর জমির রোপিত ইরি ধান গাছ বিষক্রিয়ায় পুড়ে মরে গেছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দিবাগত রাতের কোনো এক সময়ে উপজেলার চকবালু গ্রামে এই ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মো. আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে বুধবার (১ এপ্রিল) নওগাঁর বিজ্ঞ ০২ নং আমলী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
মামলার আসামিরা হলেন, ১. মো. ইসারতুল্যা (৫৫), ২. মো. মমতাজ সরদার (৪২), ৩. মো. জুয়েল রানা (২২), ৪. মো. নুরুল হুদা (৪২), ৫. মো. মিজানুর রহমান (৩৪), ৬. মো. জিয়াউল ইসলাম (৫৫), ৭. জাহিদুল ইসলাম (৩০), ৮. মো. এবাদুর রহমান (৬০), ৯. মো. মোশারফ, ১০. ইব্রাহিম (৫৫), ১১. ওয়াজেদ মন্ডল (৫৫) এবং ১২. ইউসুফ (৩৫), ১৩, কাওছার আহম্মেদ, নাজিম আহম্মেদ। তারা উপজেলার চকচোয়ার, বনকুড়া, চকশিদ্বেশ্বরী, ভরাট্ট শিবনগর ও বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।
সরেজমিনে উপজেলার চকবালু গ্রামে জমিতে গিয়ে দেখা যায়, এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। যে মাঠে কদিন আগেও সবুজের সমারোহ ছিল, সেখানে এখন মরদেহের মতো পড়ে আছে বিবর্ণ ও তামাটে রঙের ধান গাছ। বিষের তীব্রতায় কচি চারাগুলো পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রায় ১ একর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ায় ভুক্তভোগী কৃষকের আনুমানিক ৩ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলার আরজি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কশব ইউনিয়ন এলাকার দক্ষিণ চকবালু মৌজায় বাদী আমিনুল ইসলাম ও তার পূর্বপুরুষগণ দীর্ঘ ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জমি ভোগদখল করে আসছেন। গত ৩১ মার্চ ২০২৬ (মঙ্গলবার) দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে আসামিরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাদীর জমিতে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে। তারা ৮টি স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিমাণ বিষ মিশ্রিত পানি বাদীর রোপিত ধানের চারায় প্রয়োগ করে। এতে মুহূর্তেই ধান গাছগুলো পুড়ে মরে যায়।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার সময় সাক্ষীগণ বাধা দিতে গেলে আসামিরা তাদের প্রাণনাশের হুমকি ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এর আগেও আসামিরা বাদীর কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছিল। চাঁদা না দেওয়ায় তারা ইতিপূর্বে পুকুর থেকে মাছ চুরি ও ধানের চারা উপড়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়।
ভুক্তভোগী আমিনুলের ভাই গোলাম কিবরিয়া বলেন, আমরা আমাদের এই জমিগুলো ৮-১০ জন দরিদ্র বর্গাচাষীকে চাষাবাদ করতে দিয়েছিলাম। তারা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে এই ফসল ফলিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ফসল নষ্ট হওয়ায় এই গরিব মানুষগুলো আজ দিশেহারা হয়ে আমাদের কাছে এসে কান্নাকাটি করছেন। বছরে একবার হওয়া এই ফসলটি হারিয়ে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তারা আমাদের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইছেন, আর আমরা তাদের ধৈর্য ধরতে বলে সান্ত্বনা দিচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের পৈতৃক সম্পত্তিতে এমন অন্যায়ের কারণে গরিব কৃষকদের এই ভোগান্তি আমাদের ব্যথিত করেছে। আমরা ইতিমধ্যেই আইনের আশ্রয় নিয়েছি; থানায় অভিযোগের পাশাপাশি আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমরা এই অন্যায়ের সুষ্ঠু সমাধান এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ক্ষতিগ্রস্ত বর্গা চাষী কৃষক মংলা সর্দার বলেন, এই জমিটা গফুর মন্ডল, বয়ান মন্ডল ও মন্ডলের তিন শরীকের জমি। আমি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এখানে বরগা নিয়ে চাষাবাদ করছি। এবারও অনেক আশা নিয়ে ধান লাগিয়েছিলাম। কিন্তু রাতের আঁধারে কে বা কারা বিষ প্রয়োগ করে আমার সোনার ধানগুলো মেরে ফেলেছে। এখন মাঠের দিকে তাকালে বুক ফেটে যায়, ধানগুলো তামাটে হয়ে পুড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত বর্গা চাষী কৃষক মো. কালাম বলেন, আমি এখানে মন্ডলদের এই জমিগুলোতে দীর্ঘ দিন ধরে আদি বর্গাচাষী হিসেবে চাষাবাদ করে আসছি। এবারও অনেক পরিশ্রম করে আমরা ফসল ফলিয়েছিলাম। কিন্তু সকালে জমিতে পানি দিতে এসে দেখি, সব ধান গাছ এভাবে মরে পড়ে আছে। রাতের অন্ধকারে কেউ বিষ দিয়ে আমাদের এই সর্বনাশ করেছে। আমরা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন,
জমির বিরোধ থাকতে পারে, তাই বলে এভাবে বিষ দিয়ে ফসল নষ্ট করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি সরাসরি কৃষকের উপর আঘাত।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মামলার আসামি মো. ইসারতুল্যা ও মো. এবাদুর রহমান বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এই জমি আমাদের। জমি নিয়ে আদালতে বিরোধ চলছে বলেই এই সাজানো অভিযোগ করা হয়েছে।
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খোরশেদ আলম বলেন, আমি এই থানায় নতুন যোগদান করেছি, তাই বিষয়টি সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত অবগত নই। তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Devoloped By WOOHOSTBD