ভোরের নরম আলোয় যশোর শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমির মাঠে ছুটে বেড়ায় একঝাঁক কিশোর। কারও পায়ে ফুটবল, এদের চোখে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলার স্বপ্ন। ঘামে ভিজে যায় শরীর, ক্লান্ত হয় পা তবু থামে না দৌড়। কারণ তাদের কাছে এই মাঠ শুধু খেলার জায়গা নয়; এ মাঠ স্বপ্ন দেখার, নিজেকে গড়ে তোলার, একদিন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর ঠিকানা।
সকালের ফুটবল অনুশীলন শেষে তাদের হাতে ওঠে বই-খাতা। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে স্কুল পাঠ। বিকেলে আবার ফুটবল মাঠে ফেরা। মাগরিবের আগে শেষ দিনের দ্বিতীয় অনুশীলন। এরপর নাস্তা, রাতে গৃহশিক্ষকে পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন। ঘুমানো পর্যন্ত চলে এই লড়াই। একদিকে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন, অন্যদিকে শিক্ষিত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার প্রত্যয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৬০ আবাসিক ও ১২৩ অনাবাসিক শিক্ষার্থীর এই নিরন্তর পথচলার লক্ষ্য এক জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে বাংলাদেশের নামকে আরও উজ্জ্বল করা। কারও বাবা নেই, কারও বাবা দিনমজুর। অনেকের পরিবারের সামর্থ্য নেই ফুটবল প্রশিক্ষণের খরচ বহন করার। অথচ স্বপ্ন তাদের বড় হওয়া। এই স্বপ্নে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি।
শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমির বিশেষত্ব শুধু ফুটবল প্রশিক্ষণে না। এখানে খেলাধুলার পাশাপাশি শিক্ষার ওপর সমান গুরুত্ব। আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে সকাল ও বিকালে নিয়মিত ফুটবল অনুশীলন। রাতে বিশেষ গৃহশিক্ষকে চলে পাঠ্যবই ক্লাস। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিকালে ফুটবল অনুশীলনের ব্যবস্থা রয়েছে। ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে চার দিন বিকালে প্রশিক্ষণ নেয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে আবাসিক কিংবা অনাবাসিক কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ফুটবল প্রশিক্ষণে কোনো ফি নেওয়া হয় না। আবাসিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শুধু স্কুল বা কলেজের মাসিক বেতন নেওয়া হয়। ফুটবল প্রশিক্ষণ, থাকা-খাওয়া এবং গৃহশিক্ষকের কোনো অর্থ দিতে হয় না। এসব ব্যয় বহন করছেন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও রেডিয়েন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান নাসের শাহরিয়ার জাহেদী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নাসের শাহরিয়ার জাহেদীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০১১ সালের ১৪ মে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৬০ জন অনাবাসিক ছাত্র নিয়ে শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমির যাত্রা শুরু হয়।শুরুতে যশোর সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের হামিদপুর হাইস্কুল মাঠে তাদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। ২০১৩ সালে হামিদপুর বাজারে এক ভাড়া বাড়িতে শিক্ষার্থীদের আবাসিকের ব্যবস্থা হয়।
এরপর ২০১৭ সালের ১৭ মার্চ হামিদপুরের শিকদারপাড়ায় ৮০ বিঘা জমিতে আনুষ্ঠানিক শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমির মাঠ উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য রয়েছে ছয়তলা বিশিষ্ট ভবন। ‘ভাষাসৈনিক মুসা মিয়া ভবন’ নামে পরিচিত ভবন উদ্বোধন করা হয় ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। এই ভবনে রয়েছে ২৪০ জন শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা, জিমনেশিয়াম, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, লাইব্রেরি, স্টাডি ও কনফারেন্স রুম, ডাইনিং হল, প্রশাসনিক কক্ষ, গেস্টরুম, মিনি গ্যালারি ও নামাজ স্থান।
একাডেমিতে বর্তমানে পাঁচ বয়স ভিত্তিক শিক্ষার্থী রয়েছে। ১২, ১৪, ১৬, ১৮ এবং ১৮ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সী। দেশের বিভিন্ন জেলার ৬০ জন শিক্ষার্থী বর্তমানে আবাসিকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। অনাবাসিক শিক্ষার্থী ১২৩ জন। একাডেমির শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৮৩ জন। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এখানে ফুটবল প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়।
ফুটবল প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য রয়েছেন জাতীয় পর্যায়ের পাঁচজন প্রশিক্ষক। প্রতিবছর ১৯ ডিসেম্বর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আবেদন করা শিক্ষার্থী ফুটবল দক্ষতা যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে একাডেমিতে ভর্তি করা হয়।
শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ২২ জন শিক্ষার্থী ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, বাহরাইন, কাতার, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, চীন ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। এছাড়া একাডেমির বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও চীনে ফুটবলের ওপর প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। দেশের বিভিন্ন নামিদামি ক্লাবের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল খেলার সুযোগ পেয়েছে একাডেমির ২৩ জন শিক্ষার্থী।
অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবলার তাহসান খাঁর বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার বাজে বামনদা গ্রামে। বাবা নেই। ছয় বোন ও দুই ভাইয়ের সংসারে ছোটবেলা থেকে ফুটবলের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ। শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমিতে আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে সুযোগ পেয়ে ফুটবল ও লেখাপড়া দুটিই সমান চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তাহসান বলেন, একাডেমিতে সুযোগ না পেলে তার ক্যারিয়ার সামনে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হতো। এখানে ফুটবল প্রশিক্ষণ, থাকা-খাওয়া ও লেখাপড়ায় তার খরচ নেই। শুধু প্রতিমাসে কলেজে বেতন দিতে হয়। আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করছে সে। তার সাফল্যের ঝুলিতে ইতিমধ্যে যোগ হয়েছে বড় অর্জন। ২০২৫ সালে চীনে অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করে তাহসান। জেতে গোল্ডেন বুট খেতাব।
একদিকে বই-খাতা, অন্যদিকে ফুটবল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কঠোর অনুশীলন আর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন। দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য বিনা খরচে প্রশিক্ষণ, থাকা-খাওয়া ও শিক্ষার সুযোগ সব মিলিয়ে শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি যেন ফুটবলপ্রেমী তরুণদের স্বপ্ন পূরণের ব্যতিক্রমী ঠিকানা। তাহসান, তারেকদের মতো অনেক তরুণের কাছে এই একাডেমি শুধু ফুটবল শেখার জায়গা নয়,এটি তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার আশ্রয়। যে স্বপ্ন নিয়ে একাডেমিটির পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই স্বপ্ন এখন আরও বড় হয়েছে। লক্ষ্য জাতীয় দল পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন। লক্ষ্য ইউরোপের মাঠে বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলারদের পদচারণা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে যশোরের এই ফুটবল একাডেমি তৈরি করছে নতুন নতুন স্বপ্নবাজ তরুণ। এরা একদিন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরবে, এমন ফুটবলময় প্রত্যাশায় সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ডা: কামরুল ইসলাম মনা
সহ-সম্পাদকঃ ইয়াছির আরাফাত মিফতা
নির্বাহী সম্পাদকঃ মো. জাকির হোসেন মিথুন
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মন্টু রহমান
Copyright © 2026 দৈনিক হালচাল নিউজ. All rights reserved.